মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

অর্থকরী সম্পদ

খুরুশ্কুল মোটামুটিভাবে অর্থকরী সম্পদে সমৃদ্ধ। ধান, পান, লবণ, মাছ, গাছ, চিংড়ী, তাঁত, কাঁকড়া, শুটকিসহ রয়েছে বিপুল অর্থকরী সম্পদ। এসব সম্পদ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় চালান হচ্ছে। বিশেষ করে পান দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও চলে যাচ্ছে। খুরুশকুলের বিস্তীর্ণ ভূমি জুড়ে রয়েছে মিঠা পানের বরজ, সোনালী ধানের ক্ষেত ও রূপালী দানার খৈ-এর মতো লবণের মাঠ। পুরুষ পরম্পরায় এ অঞ্চলের মানুষ এই সম্পদের উপর ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আস্ছে। নিম্নে বিশেষ বিশেষ অর্থকরী সম্পদের বিবরণ দেয়া হলোঃ

 

ধানঃ খুরুশ্কুলের মোট জমির ৬,৯৬০ একর  জমিতে ধান চাষ করা হয়। তেতৈয়া, ডেইল পাড়া, রাস্তার পাড়া, পেঁচার ঘোনা, কাউয়ার পাড়া, ফকির পাড়া, মামুন পাড়া, মনু পাড়া, গাজীর ডেইল, হামজার ডেইল, রুহুললার ডেইল, কুলিয়া পাড়াসহ প্রতিটি গ্রামে চাষীরা ধান চাষ করে থাকে। খুরুশ্কুলের জমি ধান চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এখানে বছরে দু’মৌসুম ধান চাষ করা হয়। এমন অনেক লোক রয়েছে যারা সারা বৎসর ধানের ব্যবসা করে জীবন নির্বাহ করে থাকে। খুরুশ্কুলের অর্থকরী ফসলের মধ্যে ধান বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ইউনিয়নের সিংহ ভাগ মানুষ ধান চাষের সাথে জড়িত।

 

পানঃপান কক্সবাজার জেলার অন্যতম অর্থকরী ফসল। পান উৎপাদনে বাংলাদেশে বিখ্যাত কক্সবাজার জেলা। পান চাষের উপর ভিত্তি করে অন্ন সংস্থান হচ্ছে জেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের। মহেশখালী, খুরুশ্কুল, ঝিলংজা, পি.এম.খালী, রামু, মিঠাছড়ি, রাজারকুল, উখিয়া, হ্নীলা, টেকনাফসহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পানের চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সব অঞ্চলে পান বিশেষ করে খুরুশ্কুল, মহেশখালী ও কক্সবাজারের মিঠাপান কুয়েত, আরব আমিরাত,সৌদিআরবসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হচ্ছে। খুরুশ্কুলের পূর্বপাশে যে পাহাড় শ্রেণী রয়েছে সে সব পাহাড়ের পাদদেশে প্রচুর পরিমাণ পানের বরজ রয়েছে। খুরুশ্কুলের অনেক কৃষক পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কক্সবাজারের মধ্যে পান উৎপাদিত এলাকা হিসাবে আলাদা পরিচয় বহন করে চলছে খুরুশ্কুল ইউনিয়ন।

 

ঊনবিংশ শতাব্দী কিংবা তারও পূর্ব হতে কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় রমরমা পান বাজার বসতো খুরুশ্কুলের মালকাবানু বাজারে। ১৯৬৭ সালে নানাবিধ কারণে পান ব্যাবসায়ীরা বাজারটি নিয়ে আসেন টাইম বাজার। টাইম বাজারে কতদিন পান বাজারটি স্থায়ী ছিল তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। পরবর্তীতে বোটের টাইম নামে কুলিয়া পাড়ায় আরেকটি পানের বাজার গড়ে উঠলেও আট/দশ বৎসর পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। খুরুশ্কুলের পান ব্যবসায়ীরা কক্সবাজার, বাংলাবাজার, এমনকি ঘুমধুম পর্যন্ত গিয়ে পান ব্যবসা করতেন। দীর্ঘদিন আর খুরুশ্কুলে পান বাজার গড়ে উঠেনি। বর্তমান টাইম বাজারে নতুন করে একটি পান বাজার পুনঃ গড়ে উঠেছে। প্রতি বৎসর পান থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও চাষীরা যেকোন প্রকারের সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে  বঞ্চিত। সরকারিভাবে পান চাষীদের সহযোগিতা করা হলে কিংবা বিজ্ঞান সম্মত পান চাষের প্রশিক্ষণ দেয়া হলে এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের উপর নজরদারী করলে বিদেশে পান রপ্তানীতে আরও আশাতীত সাফল্য অর্জন করবে খুরুশ্কুল।  

 

লবণঃ বাংলাদেশের প্রায় ৭০ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ করা হয়। কক্সবাজার জেলা ও বাঁশখালী উপজেলার উপকূল জুড়ে লবণের চাষ হয়। কক্সবাজার জেলা ও বাঁশখালী উপজেলা লবণ চাষের জন্য একমাত্র উপযোগী স্থান। দেশের লবণ চাহিদার শতভাগ পূরণ হয় এই অঞ্চল থেকে।

 

খুরুশ্কুলের মোট ৬,৬০০ একর জমিতে লবণের চাষ হয়। মাঝের ঘাট, ছনখোলার ঘাট, তেতৈয়া, ভারুয়াখালীর ঘাট থেকে পল্লংখালী (চৌফলদন্ডী ঘাট) পর্যন্ত এবং মনুপাড়ার কিছু জমিতে লবণের চাষ করা হয়। অর্থকরী সম্পদ হিসেবে খুরুশ্কুলে লবণের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। লবণের মাধ্যমে অত্যন্ত সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করছে সংশ্লিষ্ট লবণচাষী, ব্যবসায়ীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠি।

 

মৎস্যঃমৎস্য সম্পদেও সমৃদ্ধ খুরুশ্কুল। তিন দিক থেকে খুরুশ্কুলকে বেস্টন করে আছে তিনটি নদী এবং বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরে প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। মাছের প্রাচুর্যের কারণে এ অঞ্চলে গড়ে উঠে জেলে পাড়া, নৌকা ও বোটের ব্যবসা। মাছ ধরার জন্য খুরুশ্কুলের উপকূলে প্রতি বৎসর পনের/বিশটি বোট তৈরী করা হয়। পাশাপাশি পুকুরেও মাছ চাষ করা হয়। উপকূল থেকে ধরা হয় চিংড়ীর রেনু পোনা, যা সোনার মূল্যে বিক্রি হয় কিন্তু এই রেনু পোনা ধরতে গিয়ে অনভিজ্ঞতা ও অজ্ঞতার কারণে হাজারো সামুদ্রিক মাছের পোনা মেরে ফেলা হয়। এতে সামুদ্রিক মাছ বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায়না।

 

খুরুশ্কুলে বর্তমান ৫৭টি চিংড়ী ঘের রয়েছে এবং আরো চিংড়ী ঘের তৈরীর পথে। চিংড়ী, সামুদ্রিক মৎস্য থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে খুরুশ্কু বাসী।  

 

গভীর সাগর থেকে জেলেরা মাছ ধরে এনে রোদে শুকিয়ে শুটকি করে রাখে। শুটকি মাছ খুরুশ্কুলের আরো একটি অন্যতম অর্থকরী সম্পদ। দেশে বর্তমানে শুটকির চাহিদা প্রচুর। খুরুশ্কুলের জেলেরা এ চাহিদা মিটিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হচ্ছে। মৎস্য সম্পদ একদিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনলেও অপরদিকে এই মৎস্য সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে প্রতি বছর শত শত জেলের সলিল সমাধি ঘটে এবং বিভিন্ন সময় জলদস্যুদের হাতে নিহত ও অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়। ইউনিয়ন পরিষদের দেয়া তথ্য মতে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রায় ৪৭০ জনের মত জেলের সলিল সমাধি হয়েছে।


Share with :

Facebook Twitter